পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ১৯ মে, ২০১২

বাংলাদেশে সাংবাদিকের স্বাধীনতা


প্রেস-স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শগুলো চিহ্নিত করে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে আফ্রিকার নামিবিয়ার উইন্ডহোয়েক শহরে ইউনেসকো ও ইউএনডিপিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ডিক্লারেশন অব উইন্ডহোয়েক ঘোষণার মুসাবিদা হয়। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩ মে-কে বিশ্ব প্রেস-স্বাধীনতা দিবস হিসেবে এক ঘোষণা দেয়। 
প্রেস-স্বাধীনতা কীভাবে লঙ্ঘিত বা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং কোন কোন সাংবাদিক স্বীয় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বা কারাবরণ করেছেন, সেসব তথ্য জনগণকে জানানোও এ দিবস পালনের লক্ষ্য। এ দিনে প্রেস-স্বাধীনতা মূল্যায়ন, সরকারকে প্রেস-স্বাধীনতার প্রতি তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, সাধারণ জনগণকে এ সম্বন্ধে সতর্কীকরণ এবং তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রেস-স্বাধীনতার প্রাসঙ্গিক আলোচনার বিষয় ও পেশাগত নৈতিকতার কথা মিডিয়া-পেশাজীবীদের মধ্যে গভীরভাবে চিন্তা করা, পেশাগত কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের স্মরণ করা এবং প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ বা বিলুপ্ত করার প্রয়াসে যাঁরা শিকার হয়েছেন, তাঁদের সহায়তাদান হচ্ছে ওই দিবস পালনের কর্মসূচি। 
দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মোট ১৫৪টি, যেসব ঘটনার শিকার হয়েছেন ২৮৮ জন সাংবাদিক। এর মধ্যে ১০১ জন সাংবাদিকই নির্যাতিত হন সংবাদ প্রকাশের জের ধরে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন ১১০ জন সাংবাদিক। পাশাপাশি সরকারি দলের কর্মকর্তা, কর্মচারী, ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার ৮৯ সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর হাতে প্রত্যক্ষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৭ জন সাংবাদিক।
গত বছর খুন হয়েছেন দুজন সাংবাদিক। এ বছরের গত চার মাসে মোট ৩২টি ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৪ জন সাংবাদিক। নিজ বাসভবনে খুন হয়েছেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। 
আজ সংবাদপত্র আমাদের সঙ্গে সঙ্গ দেয়। অনেকের কাছে তা নিত্যসঙ্গী। অনেকের কাছে নিত্য অবশ্যপাঠ্য। সংবাদপত্র আমাদের কৌতূহলনিরসন ও বিনোদনের উৎস। পৃথিবীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে, আমাদের বোধগম্য করে তোলে। সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও সংবাদপত্র আজ নানা ধরনের উটকো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের পারিবারিক জ্যোতিষ, চিকিৎসক, গৃহশিক্ষক, বাজারসরকার, ফ্যাশনের উপদেষ্টা এবং রেসিপির পরামর্শদাতা। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা বেশ কিছু সৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্যদান, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সাহায্য কামনা, এসিডদগ্ধদের সহায়তাদান এবং পরিবেশ রক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সমাজ ও সরকারের সহায়তায় নানা কাজ করছে আমাদের সংবাদপত্র। এখন রাজধানীর প্রেসক্লাব হচ্ছে এক অভিযোগ দাখিলের জায়গা এবং প্রতিকার প্রাপ্তির ভরসাস্থল। এর মধ্যে হুজুগে ভাগ যা-ই থাক, দেশের লোকে সংবাদপত্রকে কী চোখে দেখে এবং তার কাছ থেকে কী আশা করে, তার কিছু প্রতিফলন ঘটেছে। 
কী, কেন, কখন, কীভাবে কোথায় আর কে—এসব রাজ্যের প্রশ্নের উত্তর মানুষ আজ খোঁজে সংবাদপত্রের পাতায়। প্রাত্যহিক আবশ্যিক পাঠের ক্ষেত্রে আজ সংবাদপত্র স্থান করে নিয়েছে। ইতিহাসের আঁচড়, লিখন ও প্রথম খসড়া আজ সংবাদপত্রের পাতায় বিধৃত। কেবল সংবাদপত্রের ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু ইতিহাস লেখা হয়েছে। আমাদের দেশে ইতিহাসের মালমসলা যথাযথ সংরক্ষণ করা হয়নি। দেশে যত পত্রিকা প্রকাশিত হয়, সরকারি মহাফেজখানায় বা কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠানে তার স্থান সংকুলান হবে না। প্রেস ইনস্টিটিউট ও ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সলাপরার্শ করে সংবাদপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সব সংবাদপত্রের স্থান না হওয়ার কথা। আঞ্চলিক পত্রপত্রিকা—যার মূল্য দিতে আমরা ইতস্তত করি—সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নিকটস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে ‘ফালতু’ কাগজ সংগ্রহ করে পরে দেখা যাবে তারও একটা মূল্য রয়েছে। এভাবে আমাদের অতীত চেতনা পুষ্টি লাভ করবে। আমি ২০০২ সালের বিশ্ব প্রেস-স্বাধীনতা দিবসে যা বলেছিলাম, তার পুনরুক্তি করলাম।
আজ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে অনেক সময় মালিকের স্বাধীনতা মনে হয়। তবে সেই স্বাধীনতা আপেক্ষিক ও সীমিত। কোনো সংবাদপত্রের মালিকের পক্ষে সহজে সাংবাদিকদের ছাঁটাই করা যায় না। পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে একটি সংবাদপত্র বেশি দিন চলবে না। তথ্যাশ্রয়ী ও সত্যাশ্রয়ী সাংবাদিকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি। বলা বাহুল্য, হয়রানি থেকে তাঁকে কেউ সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিকদের ন্যায্য পাওনা গণ্ডা পেতে সারাক্ষণ তাঁদের উচ্চকিত থাকতে হয়। 
সংবাদপত্র আজ এক বড় বিনিয়োগক্ষেত্র। এখানে কেনাবেচা হয়। টাকার খেলাও হয়। হুমকিতে অনেক সময় পাতা নড়ে। সাংবাদিকদের যেমন কর্তৃপক্ষ খুশি রাখতে চায়, তেমনি সাংবাদিকেরাও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক রক্ষা করতে চান। তেমন খাসলত হলে একটি সংবাদপত্র একেবারে আশ্রিত বা পোষ্য হতে পারে। সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল। সাধারণভাবে বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে সরকার একসময় ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন ব্যক্তি-উদ্যোগের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে বিজ্ঞাপনদাতার সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি সংবাদপত্র মানসম্পন্ন না হয়, তবে সরকারের বিজ্ঞাপন-দাক্ষিণ্য পেয়ে তা টিকতে পারবে না, পাঠকেরও মন পাবে না। 
এখনো সম্পাদক বা প্রকাশকের একটা সরকারি বা সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান রয়েছে। এ সম্মানের আড়ালে তাঁরা কার কী স্বার্থ উদ্ধার করছেন, তা খুব কম পাঠকেরই জানার সুযোগ হয়। নব্বইয়ের পর থেকে এ দেশের জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির এক বিরাট অংশ সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে। আজ ঋণখেলাপি ও ভূমিদস্যুরা থেকে শুরু সামরিক-বেসামরিক নানা গোয়েন্দা সংস্থার অর্থ-সহায়তায় সংবাদপত্র প্রকাশনার অভিযোগ শোনা যায়। সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়া। সেই মৃগয়ার শিকারি অনেক সময় আশু প্রাপ্তি, চমক সৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। 
পুলিশ বিভাগ বা বিচার বিভাগের মতো যেসব জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তার পেছনে স্বাধীন সংবাদপত্রের অবদান অনেকখানি। বিচারকালে বা তদন্তকালে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, বলা বাহুল্য, তা আদালতে চূড়ান্ত রায়ের আগেই আলোচিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আজকাল অপরাধ তদন্তকালীন বিষয়ে কৌতূহলী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সংবাদে মনের মাধুরী বা বিষ মেশানোর পর লেখা হয়। শেষ পঙিক্ততে বা পাদটীকায় বলা হয়, এ ব্যাপারে তদন্তকারীকে একাধিকবার টেলিফোন করেও সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হলো না। 
সংবাদমাধ্যমে পক্ষপাতবিহীন ঘটনার বর্ণনাই বস্তুনিষ্ঠ। বস্তুনিষ্ঠার সংজ্ঞা দেওয়া মুশকিল। যাঁরা সব সময় গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ দেন, তাঁরা নিজেরা অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ থাকেন না। সংবাদমাধ্যম সবার কাছ থেকে নসিহত পেয়ে থাকে। ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে শুধু বস্তুনিষ্ঠতার পরামর্শ নয়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতারও নসিহত পেয়ে থাকে। আবার ক্ষমতালিপ্সু ও ক্ষমতাচ্যুতদের কাছ থেকে ‘সাহসী সাংবাদিকতার’ আহ্বানে ডাক আসে। তথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে। তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে সময় লাগবে। আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলো বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে বিচার বিভাগের নির্দেশনার চেয়ে সংবাদমাধ্যমের তদারকি অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে এবং হচ্ছে। কোনো নির্বাচিত সরকারের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতিমালা ও কর্মসূচিগুলো গণতান্ত্রিক সমানাধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সংগতিপরায়ণ কি না, গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার কর্তব্য হলো তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরা। 
প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রেস কমপ্লেন্টস কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড ওয়েকহ্যাম যেখানে ব্যক্তিগোপনীয়তা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমন সাতটি প্রশ্ন বিবেচনা করার জন্য সম্পাদকদের অনুরোধ করেন। অপরাধ উদ্ঘাটন, জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ, জনগণকে বিভ্রান্ত না রেখে তাদের বরং অবহিত রাখার জনস্বার্থে, না নিছক জনসাধারণের কৌতূহল মেটানোর জন্য বিতর্কিত ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হয়েছে? যদি জনস্বার্থ নিহিত থাকে, তবে এমন অন্য কোনো বিকল্প প্রকাশভঙ্গি রয়েছে কি না, যে ক্ষেত্রে গোপনীয়তার লঙ্ঘন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়? সংবাদকাহিনির অংশ হিসেবে চোরাগোপ্তাভাবে তোলা এমন ফটো ব্যবহার কি করা হচ্ছে, যা গোপনীয়তার হানি করে এবং তা কি কেবলই কাহিনির সচিত্র অলংকরণের জন্য, না জনস্বার্থে তা সরাসরি প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল? যদি কাহিনিটির সঙ্গে কোনো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে, তবে অন্য কোনোভাবে তা প্রকাশ করা যায় কি না, যার ফলে যার গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে তার নিরপরাধ এবং অসহায় আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে তার সন্তানাদির ওপর, সবচেয়ে কম বিরূপ প্রভাব পড়বে? জনসমক্ষে বিচরণ করেন বা জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন একজন জননায়কের সম্পর্কে কোনো কাহিনি প্রকাশ করতে গিয়ে কী বিবেচনা করা হয়েছে যে ব্যাপারটি অত্যন্ত অপরোক্ষ ও অনিকট এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে কোনো জনস্বার্থ নিহিত নেই? একজন জননায়কের পুরোনো বক্তব্য বা কর্মের সঙ্গে তাঁর বর্তমান জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কী বিবেচনা করা হয়েছে যে সেই তুলনা ন্যায্য এবং পূর্বতন বক্তব্য বা কর্ম এমনই ইদানীন্তন যে জনস্বার্থে সে সম্পর্কে কাহিনি প্রকাশ করা যায়? একজনের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কে আগে যেখানে জনস্বার্থ নিহিত ছিল, সে সম্পর্কে পরে কোনো কাহিনি প্রকাশ করার আগে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো নতুন করে বিবেচনা করা হয়েছে কি যে তেমন কোনো জনস্বার্থের অজুহাত আর বিদ্যমান নেই? গভীর বিবেচনা করে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে। গরম গরম সংবাদ পরিবেশনে তা খেয়ালে থাকলে সবার জন্যই সে হবে মঙ্গলকর। 
আমাদের দেশের যোগাযোগমাধ্যম এক উচ্চাবচ বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে কাল অতিবাহিত করে আসছে। ১৯৭৫সালে সংবাদপত্রের সংখ্যা নিদারুণভাবে সীমিত করা হয়। অনেক সময় সম্পাদকদের সেলফসেন্সর বা আত্মদমনের জন্যও সমস্যার সৃষ্টি হয়। পঞ্চাশের গোড়ার দিকে একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রকাশনা বন্ধ করা হলে আমি একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিকে আমার মন্তব্য চিঠির আকারে পাঠিয়েছিলাম। চিঠিটি ছাপানো হয়নি। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় শত্রুর সঙ্গে যোগসাজশের জন্য যখন ৪০ হাজার মামলা রুজু করা হয় তখন একটি ইংরেজি চিঠিতে মন্তব্য করি যে এমন করলে বিচারব্যবস্থার সব প্রণালি বন্ধ হয়ে যাবে এবং সরকারকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকবে না। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকে চিঠিটা ছাপানো হয়নি। ১৯৮১ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ‘সৈনিকেরা ব্যারাকে ফিরে যাবে’ একটি বিদেশি সাপ্তাহিক, মার্কিন মুলুকের নিউজউইক-এ কেবল প্রকাশিত হয়। ঢাকার প্রধান প্রধান দৈনিক সংবাদপত্র তখন সেনাবাহিনীপ্রধানের সেনানিবাস থেকে সেনানিবাসে দৌড়ঝাঁপের কথা বেশ বড় করে ছাপায়। দেশের অসামরিক শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে তার মতকে বিশেষভাবে আলোকিত করা হয়। এ কথাগুলো আমি ১৯৯৮ সালের ২৬ আগস্ট বলেছিলাম একটি সংবাদ এজেন্সির ১০ বছরপূর্তি উপলক্ষে।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মতোই সাংবাদিকেরা প্রধানত দুই শিবিরে বিভক্ত। কয়েক বছর আগে সাংবাদিকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা বলতে গিয়ে বড় দুঃখে টিপু সুলতান বলেন, ‘আমি আহত হওয়ার পর সাংবাদিকদের দুই ইউনিয়ন এক হয়ে যৌথ বিবৃতি দিতে ২১ দিন সময় লেগেছিল। আর হারুন অর রশিদ মারা যাওয়ার পরদিন বিবৃতি এসেছে। তবে পৃথক পৃথক বিবৃতি। .....সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি কিংবা যৌথ কোনো বিবৃতি আজও চোখে পড়েনি। সাংবাদিকদের বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তরা। নিরাপত্তার অভাবে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার। .... আর সুবিচার পাওয়ার ব্যাপারে অন্তত সাংবাদিকদের দুই ইউনিয়ন এক হবে এ ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’ 
কাক নির্যাতিত হলে সহকর্মী কাকেরা তার সমর্থনে চিৎকার করে। সাংবাদিক নির্যাতিত হলে তাঁর স্বীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে অনেক সময় কাকসদৃশ ব্যবহার পাওয়া যায় না। মানুষ সাংবাদিকের নানা টানাপোড়েন রয়েছে। সে নিয়ে দুঃখ বা মাতম না করে নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়ানোই আমি শ্রেয়স্কর মনে করি।
অবস্থাদৃষ্টে কি মনে হয় অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে? সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনির হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে গোষ্ঠীনির্বিশেষে সব সাংবাদিক একযোগে সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি নিতে পারছেন। 
পশ্চিমা জগতে বহু বছরের পুরোনো বনেদি সংবাদপত্রকে ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে পাট গুটাতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র দেখে মনে হচ্ছে, আর্থিকভাবে তা এখনো সহিসালামতে আছে। 
একদিক থেকে বাংলাদেশ অনুসন্ধানী ও অন্তর্ভেদী রিপোর্টারের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। আইন-অপরাধ—তদন্তের জগতে, কর-শুল্ক খাতে, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার-অপব্যবহারে এবং সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং বাজিকরদের তেলেসমাতি সংঘটিত হচ্ছে তা অবিশ্বাস্য রকমভাবে চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক। বাঁধাধরা তদন্তে এসব অনিয়মের উদ্ঘাটন করে শাসন বা বিচার করা কঠিন ব্যাপার। সাংবাদিকেরা ক্বচিৎ সংবাদজগতের অপসংস্কৃতি, অশুভ প্রভাব, হুমকিধমকি, অপ-অর্জন বা দুর্নীতি সম্পর্কে লিখে থাকেন। হিমবাহের শীর্ষ দেশের কিছু কথা মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়। বেশির ভাগই তো অতল অন্ধকারে। আমরা কী এতই হতভাগা যে এক অস্বচ্ছ তমসাচ্ছন্ন এবং প্রতিকারহীন অবস্থাকে নিয়তি হিসেবে আমাদের মেনেই নিতে হবে? 
১৯ মে ‘যাত্রী’, ‘বিসিডিজেসি’, ‘বিএনএনআরসি’ ও ‘ইউনেসকো’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে পঠিত। 
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। সাবেক প্রধান বিচারপতি।

সারা বাংলাদেশই দুই শিবিরে বিভক্ত

প্রেস-স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শগুলো চিহ্নিত করে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে আফ্রিকার নামিবিয়ার উইন্ডহোয়েক শহরে ইউনেস্কো ও ইউএনডিপিআই-র যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ডিক্ল্যারেশন অব উইন্ডহোয়েক ঘোষণাটির মুসাবিদা হয়। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩ মে-কে বিশ্ব প্রেস-স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। আজ আমরা ১৬ দিন পর দিবসটি উদযাপন করছি।
প্রেস-স্বাধীনতা কিভাবে লঙ্ঘিত বা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং কোন কোন সাংবাদিক স্বীয় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বা কারাবরণ করেছেন- সেসব তথ্য জনগণকে জানানোও এই দিবস পালনের লক্ষ্য। এই দিনে প্রেস-স্বাধীনতা মূল্যায়ন, সরকারকে প্রেস-স্বাধীনতার প্রতি তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, সাধারণ জনগণকে এ সম্বন্ধে সতর্কীকরণ এবং তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রেস-স্বাধীনতার প্রাসঙ্গিক আলোচনার বিষয় ও পেশাগত নৈতিকতার কথা মিডিয়া-পেশাজীবীদের মধ্যে গভীরভাবে চিন্তা করা, পেশাগত কর্তব্য করতে গিয়ে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের স্মরণ করা এবং প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ বা বিলুপ্ত করার প্রয়াসে যাঁরা শিকার হয়েছেন তাঁদের সহায়তাদান হচ্ছে ওই দিবস পালনের কর্মসূচি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায় যে ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মোট ১৫৪টি, যেসব ঘটনার শিকার হয়েছেন ২৮৮ জন সাংবাদিক। এর মধ্যে ১০১ জন সাংবাদিকই নির্যাতিত হন সংবাদ প্রকাশের জের ধরে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন ১১০ জন সাংবাদিক। পাশাপাশি সরকারি দলের কর্মকর্তা, কর্মচারী, ক্যাডার, সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার ৮৯ জন সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের হাতে প্রত্যক্ষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৭ জন সাংবাদিক।
গত বছর খুন হয়েছেন দুজন সাংবাদিক। এ বছরের গত চার মাসে মোট ৩২টি ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৪ জন সাংবাদিক। নিজ বাসভবনে খুন হয়েছেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি।
আজ সংবাদপত্র আমাদের সঙ্গ দেয়। অনেকের কাছে তা নিত্যসঙ্গী। অনেকের কাছে নিত্য অবশ্যপাঠ্য। সংবাদপত্র আমাদের কৌতূহল নিরসন ও বিনোদনের উৎস। পৃথিবীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে, আমাদের বোধগম্য করে তোলে। সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও সংবাদপত্র আজ নানা ধরনের উটকো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের পারিবারিক জ্যোতিষ, চিকিৎসক, গৃহশিক্ষক, বাজার সরকার, ফ্যাশনের উপদেষ্টা এবং রেসিপির পরামর্শদাতা। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা বেশ কিছু সৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্যদান, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সাহায্য কামনা, এসিডদগ্ধদের সহায়তাদান এবং পরিবেশ রক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সমাজ ও সরকারের সহায়তায় নানা কাজ করছে আমাদের সংবাদপত্র। এখন রাজধানীর প্রেসক্লাব হচ্ছে এক অভিযোগ দাখিলের জায়গা এবং প্রতিকার প্রাপ্তির ভরসাস্থল। এর মধ্যে হুজুগে ভাগ যাই থাক দেশের লোকে সংবাদপত্রকে কী চোখে দেখে এবং তার কাছ থেকে কী আশা করে তার কিছু প্রতিফলন ঘটেছে।
কী, কেন, কখন, কিভাবে কোথায় আর কে- এসব রাজ্যের প্রশ্নের উত্তর মানুষ আজ খোঁজে সংবাদপত্রের পাতায়। প্রাত্যহিক আবশ্যিক পাঠের ক্ষেত্রে আজ ধর্মগ্রন্থের ওপরে সংবাদপত্র স্থান করে নিয়েছে। ইতিহাসের আঁচড়, লিখন ও প্রথম খসড়া আজ সংবাদপত্রের পাতায় বিধৃত। কেবল সংবাদপত্রের ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু ইতিহাস লেখা হয়েছে। আমাদের দেশে ইতিহাসের মালমসলা যথাযথ সংরক্ষণ করা হয়নি। দেশে যত পত্রিকা প্রকাশিত হয় সরকারি মহাফেজখানায় বা কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠানে তার স্থান সঙ্কুলান হবে না। প্রেস ইনস্টিটিউট ও ইউনির্ভাসিটি গ্রান্টস কমিশন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে সংবাদপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সব সংবাদপত্রের স্থান না হওয়ার কথা। আঞ্চলিক পত্রপত্রিকা- যার মূল্য দিতে আমরা ইতঃস্তত করি- সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নিকটস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে 'ফালতু' কাগজ সংগ্রহ করে পরে দেখা যাবে তারও একটা মূল্য রয়েছে। এভাবে আমাদের অতীতচেতনা পুষ্টি লাভ করবে। আমি ২০০২ সালের বিশ্ব প্রেস-স্বাধীনতা দিবসে যা বলেছিলাম তার পুনরুক্তি করলাম।
আজ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে অনেক সময় মালিকের স্বাধীনতা মনে হয়। তবে সেই স্বাধীনতা আপেক্ষিক ও সীমিত। কোনো সংবাদপত্রের মালিকের পক্ষে সহজে সাংবাদিকদের ছাঁটাই করা যায় না। পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে একটি সংবাদপত্র বেশি দিন চলবে না। তথ্যাশ্রয়ী ও সত্যাশ্রয়ী সাংবাদিকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি, বলাবাহুল্য হয়রানি থেকে তাঁকে কেউ সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিকদের ন্যায্য পাওনাগণ্ডা পেতে সারাক্ষণ তাঁদের উচ্চকিত থাকতে হয়।
সংবাদপত্র আজ এক বড় বিনিয়োগক্ষেত্র। এখানে কেনাবেচা হয়। টাকার খেলাও হয়। হুমকিতে অনেক সময় পাতা নড়ে। সাংবাদিকদের যেমন কর্তৃপক্ষ খুশি রাখতে চায়, তেমনি সাংবাদিকরাও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক রক্ষা করতে চান। তেমন খাসলত হলে একটি সংবাদপত্র একেবারে আশ্রিত বা পোষ্য হতে পারে। সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল। সাধারণভাবে বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে সরকার এক সময় ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন ব্যক্তি-উদ্যোগের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে বিজ্ঞাপনদাতার সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি সংবাদপত্র মানসম্পন্ন না হয় তবে সরকারের বিজ্ঞাপন-দাক্ষিণ্য পেয়ে তা টিকতে পারবে না, পাঠকেরও মন পাবে না।
এখনো সম্পাদক বা প্রকাশকের একটা সরকারি বা সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান রয়েছে। এই সম্মানের আড়ালে তাঁরা কার কী স্বার্থ উদ্ধার করছেন, তা খুব কম পাঠকেরই জানার সুযোগ হয়। নব্বইয়ের পর থেকে এ দেশের জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির এক বিরাট অংশ সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছে। আজ ঋণখেলাপি ও ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে সামরিক-বেসামরিক নানা গোয়েন্দা সংস্থার অর্থ-সহায়তায় সংবাদপত্র প্রকাশনার অভিযোগ শোনা যায়। সংবাদপত্রে বিনিয়োগ বিত্তবানদের জন্য আজ এক আকর্ষণীয় মৃগয়া। সেই মৃগয়ার শিকারি অনেক সময় আশুপ্রাপ্তি, চমকসৃষ্টি কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ছাপার অক্ষরে কিছু প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না।
পুলিশ বিভাগ বা বিচার বিভাগের মতো যেসব জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে তার পেছনে স্বাধীন সংবাদপত্রের অবদান অনেকখানি। বিচারকালে বা তদন্তকালে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে, বলাবাহুল্য, তা আদালতে চূড়ান্ত রায়ের আগেই আলোচিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আজকাল অপরাধ তদন্তকালে বিষয়ে কৌতূহলী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সংবাদে মনের মাধুরী বা বিষ মেশানোর পর লেখা হয়। শেষ পঙ্ক্তিতে বা পাদটীকায় বলা হয়, এ ব্যাপারে তদন্তকারীকে একাধিকবার টেলিফোন করেও সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হলো না।
ইরাক যুদ্ধের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধরত সামরিক বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় যে সাংবাদিকরা কাজ করেন, তাঁদের কাজকে embedded journalism বা প্রোথিত সাংবাদিকতা বলা হয়। বর্তমানকালের যুদ্ধে পারমাণবিক, বিজাণুবাহক বা রাসায়নিক অস্ত্রশস্ত্রের সম্মুখে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কিছু সাংবাদিক সেনাবাহিনীর কাছে ন্যূনতম সহযোগিতা আশা করে থাকেন। বেশির ভাগ সাংবাদিক মনে করেন, যুদ্ধের নিদারুণ ভয়াবহতা সত্ত্বেও যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় সাংবাদিকরা তাঁদের কর্তব্যকর্ম স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পালন করতে পারবেন না। প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিজেদের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্মপন্থা আবিষ্কার করতে হবে।
সংবাদ মাধ্যমে পক্ষপাতবিহীন ঘটনার বর্ণনাই বস্তুনিষ্ঠ। বস্তুনিষ্ঠতার সংজ্ঞা দেওয়া মুশকিল। যাঁরা সব সময় গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ দেন, তাঁরা নিজেরা অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ থাকেন না। সংবাদ মাধ্যম সবার কাছ থেকে নসিহত পেয়ে থাকে। ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে শুধু বস্তুনিষ্ঠতার পরামর্শ নয়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতারও নসিহত পেয়ে থাকে। আবার ক্ষমতালিপ্সু ও ক্ষমতাচ্যুতদের কাছ থেকে 'সাহসী সাংবাদিকতার' ডাক আসে। তথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে। তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে সময় লাগবে। আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে বিচার বিভাগের নির্দেশনার চেয়ে সংবাদ মাধ্যমের তদারকি অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে এবং হচ্ছে। কোনো নির্বাচিত সরকারের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতিমালা ও কর্মসূচিগুলো গণতান্ত্রিক সমানাধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গতিপরায়ণ কি না, গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার কর্তব্য হলো তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরা।
প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর কিছু দিন আগে প্রেস কমপ্লেন্টস কমিশনের চেয়ারম্যান লর্ড ওয়েকহ্যাম যেখানে ব্যক্তি গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে তেমন সাতটি প্রশ্ন বিবেচনা করার জন্য সম্পাদকদের অনুরোধ করেন। অপরাধ উদ্ঘাটন, জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ, জনগণকে বিভ্রান্ত না রেখে তাদের বরং অবহিত রাখার জনস্বার্থে, না নিছক জনসাধাণের কৌতূহল মেটানোর জন্য বিতর্কিত ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হয়েছে? যদি জনস্বার্থ নিহিত থাকে তবে এমন অন্য কোনো বিকল্প প্রকাশভঙ্গি রয়েছে কি না যে ক্ষেত্রে গোপনীয়তার লঙ্ঘন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়? সংবাদ-কাহিনীর অংশ হিসেবে চোরাগোপ্তাভাবে তোলা এমন ফটো ব্যবহার কি করা হচ্ছে, যা গোপনীয়তার হানি করে এবং তা কি কেবলই কাহিনীর সচিত্র অলঙ্করণের জন্য, না জনস্বার্থে তা সরাসরি প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল? যদি কাহিনীটির সঙ্গে কোনো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে তবে অন্য কোনোভাবে তা প্রকাশ করা যায় কি না, যার ফলে যার গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তার নিরাপরাধ এবং অসহায় আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে তার সন্তানাদির ওপর, সবচেয়ে কম বিরূপ প্রভাব পড়বে? জনসমক্ষে বিচরণ করেন বা জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন একজন জননায়কের সম্পর্কে কোনো কাহিনী প্রকাশ করতে গিয়ে কি বিবেচনা করা হয়েছে যে ব্যাপারটি অত্যন্ত অপরোক্ষ ও অনিকট এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে কোনো জনস্বার্থ নিহিত নেই? একজন জননায়কের পুরনো বক্তব্য বা কর্মের সঙ্গে তাঁর বর্তমান জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কি বিবেচনা করা হয়েছে যে সেই তুলনা ন্যায্য এবং পূর্বতন বক্তব্য বা কর্ম এমনই ইদানীন্তন যে জনস্বার্থে সে সম্পর্কে কাহিনী প্রকাশ করা যায়? একজনের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কে পূর্বে যেখানে জনস্বার্থ নিহিত ছিল, সে সম্পর্কে পরে কোনো কাহিনী প্রকাশ করার আগে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো নতুন করে বিবেচনা করা হয়েছে কি যে তেমন কোনো জনস্বার্থের অজুহাত আর বিদ্যমান নেই? গভীর বিবেচনা করে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে। গরম গরম সংবাদ পরিবেশনে তা খেয়ালে থাকলে সবার জন্যই তা হবে মঙ্গলকর।
আমাদের দেশের যোগাযোগ মাধ্যম এক উচ্চাবচ বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে কাল অতিবাহিত করে আসছে। ১৯৭৪ সালে সংবাদপত্রের সংখ্যা নিদারুণভাবে সীমিত করা হয়। অনেক সময় সম্পাদকদের সেলফসেন্সর বা অবদমনের জন্যও সমস্যার সৃষ্টি হয়। পঞ্চাশের গোড়ার দিকে একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রকাশনা বন্ধ করা হলে আমি একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিকে আমার মন্তব্য চিঠির আকারে পাঠিয়েছিলাম। চিঠিটি ছাপানো হয়নি। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় শক্রর সঙ্গে যোগসাজশের জন্য যখন ৪০ হাজার মামলা রুজু করা হয় তখন একটি ইংরেজি চিঠিতে মন্তব্য করি যে এমন করলে বিচারব্যবস্থার সব প্রণালী বন্ধ হয়ে যাবে এবং সরকারকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকবে না। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকে চিঠিটা ছাপানো হয়নি। ১৯৮১ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য 'সৈনিকেরা ব্যারাকে ফিরে যাবে' একটি বিদেশি সাপ্তাহিক, মার্কিন মুলুকের নিউজউইক-এ কেবল প্রকাশিত হয়। ঢাকার প্রধান প্রধান দৈনিক সংবাদপত্রে তখন সেনাবাহিনী প্রধানের সেনানিবাস থেকে সেনানিবাসে দৌড়ঝাঁপের কথা বেশ বড় করে ছাপায়। দেশের অসামরিক শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর মতকে বিশেষভাবে আলোকিত করা হয়। এই কথাগুলো আমি ১৯৯৮ সালের ২৬ আগস্ট বলেছিলাম একটি সংবাদ এজেন্সির দশ বছরপূর্তি উপলক্ষে।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মতোই সাংবাদিকরা প্রধানত দুই শিবিরে বিভক্ত। কয়েক বছর আগে সাংবাদিকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা বলতে গিয়ে বড় দুঃখে টিপু সুলতান বলেন, 'আমি আহত হওয়ার পর সাংবাদিকদের দুই ইউনিয়ন এক হয়ে যৌথ বিবৃতি দিতে ২১ দিন সময় লেগেছিল। আর হারুন অর রশিদ মারা যাওয়ার পর দিন বিবৃতি এসেছে। তবে পৃথক পৃথক বিবৃতি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, জাতির বিবেক বলে দাবিদার সাংবাদিকরা দুই শিবিরে বিভক্ত। যতই দিন যাচ্ছে এই বিভক্তি যেন আরো প্রকট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আজ সারা বাংলাদেশই দুই শিবিরে বিভক্ত। ....সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি কিংবা যৌথ কোনো বিবৃতি আজও চোখে পড়েনি। সাংবাদিকদের বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তরা। নিরাপত্তার অভাবে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার। এ অবস্থায় নিজেদের স্বার্থ নিজেদেরই দেখতে হবে। সাংবাদিকরা দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এলে সুশীল সমাজও সাংবাদিকদের পাশে এসে দাঁড়াবে, এ আমার বিশ্বাস। ....আর সুবিচার পাওয়ার ব্যাপারে অন্তত সাংবাদিকদের দুই ইউনিয়ন এক হবে এ ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।'
কাক নির্যাতিত হলে সহমর্মী কাকেরা তার সমর্থনে চিৎকার করে। নির্যাতিত সাংবাদিক তাঁর স্বীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে অনেক সময় কাকসদৃশ ব্যবহার পায় না। মানুষ-সাংবাদিকদের নানা টানাপড়েন রয়েছে। সে নিয়ে দুঃখ বা মাতম না করে নির্যাতিতের পাশে দাড়ানোই আমি শ্রেয়স্কর মনে করি।
অবস্থাদৃষ্টে কি মনে হয় অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে? সাংবাদিক-দম্পত্তি সাগর ও রুনির হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবিতে গোষ্ঠীনির্বিশেষে সব সাংবাদিক একযোগে সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি তো নিতে পারছেন।
টগবগে তরুণ সমাজের কাছে সময়ের তাড়া বেশি। বৈদ্যুতিক মাধ্যম পরিবেশিত সংবাদ শোনা বা পড়ার পর তাদের উৎসাহ নেই কালো অক্ষরে সংবাদ পড়ার। কিচিরমিচির টুইটার থেকে গালভরা সব নাম ফেসবুক, ব্লগ, ইউটিউব ইত্যাদির প্রতি তাদের আকর্ষণ অনেক বেশি। পশ্চিমা জগতে বহু বছরের পুরনো বনেদি সংবাদপত্রকে ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে পাট গুটাতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র দেখে মনে হচ্ছে, আর্থিকভাবে তা এখনো সহিসালামতে আছে।
একদিক থেকে বাংলাদেশ অনুসন্ধানী ও অন্তর্ভেদী রিপোর্টারের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। আইন-অপরাধ-তদন্তের জগতে, কর-শুল্কখাতে, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার-অপব্যবহারে এবং সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং বাজিকরদের তেলেসমাতি সংঘটিত হচ্ছে তা অবিশ্বাস্যরকমভাবে চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক। বাঁধাধরা তদন্তে এসব অনিয়মের উদ্ঘাটন করে শাসন বা বিচার করা কঠিন ব্যাপার। সাংবাদিকরা ক্বচিৎ সংবাদজগতের অপসংস্কৃতি, অশুভ প্রভাব, হুমকিধামকি, অপঅর্জন বা দুর্নীতি সম্পর্কে লিখে থাকেন। হিমবাহের শীর্ষদেশের কিছু কথা মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়। বেশির ভাগই তো অতল অন্ধকারে। আমরা কি এতই হতভাগা যে এক অস্বচ্ছ, তমসাচ্ছন্ন এবং প্রতিকারহীন অবস্থাকে নিয়তি হিসেবে আমাদের মেনেই নিতে হবে।

[১৯ মে, ২০১২ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের 'যাত্রী', 'বিসিডিজেসি', 'বিএনএনআরসি' ও 'ইউনেস্কো'র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত প্রধান অতিথি বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান-এর বক্তব্য।]

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

বাংলা ভাষার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে


habibur111111আমি এর আগেও অন্য এক জায়গায় বলেছিলাম যে বহুভাষার দেশ ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্য ইংরেজি সূত্রে-গ্রন্থিত ছিল। স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী ভারত সেই একইসূত্রে এখনো গ্রন্থিত। মাতৃভাষা, জাতীয় ভাষা বা শিক্ষার মাধ্যম প্রসঙ্গে ভারতের গুনীব্যক্তিদের আকর্ষণীয় বক্তব্য আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬২–১৯৪১) মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের মতো স্বাস্থ্যদায়ক বলে একাধিকবার বক্তব্য রাখেন। তাঁর মতে, আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার পক্ষে ইংরেজি শিক্ষার যেমন প্রয়োজন তেমনি মনকে ও ব্যবহারকে মূঢ়তামুক্ত করার জন্য তার প্রভাব মূল্যবান। তিনি অবশ্য দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্কার করে বলেন, ‘দূর দেশি ভাষার থেকে আমরা বাতির আলো সংগ্রহ করতে পারি মাত্র। কিন্তু আত্মপ্রকাশের জন্য প্রভাত আলো বিকীর্ণ হয় আপন ভাষায়।’
অসহযোগ আন্দোলনের সময় জগদানন্দ রায়কে একপত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সেদিন যখন খবরের কাগজে পড়লুম মহাত্মা গান্ধী আমাদের মেয়েদের বলেছেন, তোমরা ইংরেজি পড়া বন্ধ কর, সেইদিন বুঝেছি আমাদের দেশে দেওয়াল গাঁথা হয়েছে, অর্থাৎ নিজের ঘরকে নিজে কারাগার করে তোলাকেই আমরা মুক্তির পথ বলে মনে করচি–আমরা বিশ্বের সমস্ত আলোককে বহিষ্কৃত করে দিয়ে নিজের ঘরের অন্ধকারকেই পূজা করতে বসেছি–এ কথা ভুলচি, যে-সব দুর্দান্ত জাতি পরকে আঘাত করে’ বড় হতে চায় তারাও যেমন বিধাতার ত্যাজ্য, তেমনি যারা পরকে বর্জন করে’ স্বেচ্ছাপূর্বক ক্ষুদ্র হতে চায় তারাও তেমনি বিধাতার ত্যাজ্য।’
ওই পত্রের প্রতি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৯)র দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিরাবেগে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ‘ভুয়া অহমিকা অথবা সন্দেহজনক সামাজিক ইজ্জতের দরুন আমি আমার ভগিনীদের উপর ইংরেজি শিক্ষার জন্য অপ্রয়োজনীয় জবরদস্তি চালাতে চাই না। আমি চাইব আমাদের সাহিত্যরসিক সমস্ত যুবক-যুবতী তাদের ইচ্ছামত ইংরেজি এবং বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষা শিক্ষা করুন এবং এও আমার প্রত্যাশা যে, একজন বসুর (জগদীশচন্দ্র) মত, একজনের রায়ের (প্রফুল্লচন্দ্র) মত, অথবা স্বয়ং কবির মত তারা তাদের শিক্ষার ফসল ভারতবর্ষ ও সারা বিশ্বকে দান করবেন। কিন্তু আমি চাইব না কোন একজনও ভারতীয় তার মাতৃভাষা ভুলে যাক, বা অবজ্ঞা করুক, বা তজ্জন্য লজ্জাবোধ করুক; অথবা তাদের সর্বোত্তম ভাবনারাশি মাতৃভাষায় চিন্তা অথবা প্রকাশ করতে তারা অপরাগ, এমন ভাবনায় তারা উদ্বুদ্ধ হোক এও আমি চাইব না।’
গান্ধীর মতে, নিজের মাতৃভাষাকে ছোট করা মানে নিজের মাকে ছোট করা। তিনি বলেন, যখন তিনি ইংরেজি বলেন, তখন তাঁর মনে হয় আমি একটা পাপ করেছি। রবীন্দ্রনাথের নানা ধরনের পাপবোধ ছিল, যেমন তাঁর মতে মানুষের প্রতি অবিশ্বাস করা মহাপাপ। কিন্তু ভাষার বিষয়ে তার তেমন কোনো পাপবোধ ছিল না।
গান্ধী তাঁর প্রথম প্রধান বই ‘হিন্দ স্বরাজ’ হিন্দিতে লেখেন। অল ইন্ডিয়া কমন স্ক্রিপ্টঅ্যান্ড কমন ল্যাঙ্গুয়েজ কনফারেন্সে গান্ধী হিন্দিকে ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য জোর দেন। ভারতীয় ঐক্যের প্রশ্নে ভাষার প্রসঙ্গটি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ১৩৩০ সালে সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘বাল্যকালে এমন আলোচনাও আমি শুনেছি যে, বাঙালি যে বঙ্গভাষার চর্চায় মন দিয়েছে এতে করে ভারতীয় ঐক্যের অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ ভাষার শক্তি বাড়তে থাকলে তার দৃঢ় বন্ধনকে শিথিল করা কঠিন হয়। তখনকার দিনে বঙ্গসাহিত্য যদি উৎকর্ষ লাভ না করত তবে আজকে হয়তো তার প্রতি মমতা ছেড়ে দিয়ে আমরা নির্বিকার চিত্তে কোনো একটি সাধারণ ভাষা গ্রহণ করে বসতাম। কিন্তু ভাষা জিনিসের জীবনধর্ম আছে। তাকে ছাঁচে ঢেলে কলে ফেলে ফরমাশে গড়া যায় না। তার নিয়মকে স্বীকার করে নিয়ে তবেই তার কাছ থেকে সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধগামী হলে সে বন্ধ্যা হয়।’
হিন্দি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমি হিন্দি জানি না, কিন্তু আমাদের আশ্রমের একটি বন্ধুর কাছ থেকে প্রথমে আমি প্রাচীন হিন্দি সাহিত্যের আশ্চর্য রত্নসমূহের কিছু কিছু পরিচয় লাভ করেছি। প্রাচীন হিন্দি কবিদের এমন-সকল গান তাঁর কাছে শুনেছি যা শুনে মনে হয় সেগুলি যেন আধুনিক যুগের। তার মানে হচ্ছে, যে-কাব্য সত্য তা চিরকালই আধুনিক। আমি বুঝলুম, যে- হিন্দিভাষার ক্ষেত্রে ভাবের এমন সোনার ফসল ফলেছে সে-ভাষা যদি কিছুদিন আকৃষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, তবু তার স্বাভাবিক উর্বরতা মরতে পারে না; সেখানে আবার চাষের সুদিন আসবে এবং পৌষ মাসে নবান্ন-উৎসব ঘটবে। এমনি করে এক সময় আমার বন্ধুর সাহায্যে এ দেশের ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে আমার শ্রদ্ধার যোগ স্থাপিত হয়েছিল। উত্তর-পশ্চিমের সঙ্গে সেই শ্রদ্ধার সম্বন্ধটি যেন আমাদের সাধনার বিষয় হয়। মা বিদ্বিষাবহৈ।’
১৯২৭ সালে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘হিন্দিভাষা ভাবী রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা কেবল রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয়তায় সিদ্ধ হয় না, সাহিত্যের দিকে তার উপযোগিতা দেখাতে হবে। ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি কেবল সাহিত্যের দাবি পূরণ করে মেটানো যায়।’
১৯৩৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে উর্দুকে ভারতের মুসলমানদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য একটা প্রস্তাব করা হয়। বঙ্গ প্রদেশের প্রতিনিধিরা জোর আপত্তি তোলেন। জিন্নাহর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে অবশেষে প্রস্তাবটি পবিরবর্তিত আকারে গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘যেখানে উর্দু একটি অঞ্চলের ভাষা সেখানে উর্দুর নির্বাধ উন্নয়ন ও ব্যবহার বহাল থাকবে এবং যেখানে প্রধান ভাষা নয় সেখানে ঐচ্ছিক ভাষা হিসাবে উর্দু শিক্ষাদানের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে’
১৯৩৮ সনের ১৯-২১ ফেব্র–য়ারি ভারতের গুজরাটের হরিপুরাতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কংগ্রেস অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে সুভাষচন্দ্র বসু বলেন, ‘জাতীয় সংহতির জন্য আমাদেরকে আমাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও একটি সাধারণ বর্ণমালার উন্নতি বিধান করতে হবে… আমি মনে করি হিন্দি ও উর্দুর মধ্যকার পার্থক্য কৃত্রিম। সবচেয়ে স্বাভাবিক লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হতে হবে ওই দুইয়ের মিশ্রণ যেভাবে দৈনন্দিন জীবনে দেশের বৃহৎ অংশে কথা বলা হয় এবং এই সাধারণ ভাষা নাগরী ও উর্দু দুই লিপিতেই লেখা যেতে পারে।’
‘কংগ্রেস সভাপতি হিন্দিকেই রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেছেন। এতে বাঙালীর কি দুঃখিত হবার কারণ নেই? বহুসমৃদ্ধ বাংলাভাষা রাষ্ট্র ভাষা হবার গৌরব থেকে বঞ্চিত হল কোন্ অপরাধে? ’ ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮ সালে পূর্ব্বাশার সম্পাদক কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য রবীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে এই বলে তাঁর অভিমত জানতে চান। ওই পত্রের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে কংগ্রেস যদি বিশ্বভারতের রাষ্ট্রভাষা বলে গণ্য করে–তাহলে এ নিয়ে আমি আপত্তি করব না। কংগ্রেসের কর্তব্য কংগ্রেসের হাতে। আমি সভ্যশ্রেণীতেও নেই।–তোমরা যদি বৃথা চেষ্টা করতে চাও করো–তোমাদের বয়স অল্প, যথেষ্ট সময় আছে’ (সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে লিখিত পত্র সংখ্যা-৬/১৬ চিঠিপত্র, পৃ. ২৩০)
১৯৫২ সালের ফেব্র–য়ারি মাসে ঢাকা রাজধানী হওয়ার পাঁচ বছরও হয়নি। একুশে ফেব্র–য়ারির পর ঢাকা হলো সারাদেশের হৃদকেন্দ্র। ‘ঢাকায় কি হচ্ছে? ঢাকা কেমন হচ্ছে?’–সারাদেশের কাছে এক আলোড়িত প্রশ্ন। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহর-উপশহর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিতে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল। রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনকারীরা দাবি করছে তাদের শহরেই প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রামে তো রচিত হলো একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম কবিতা মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাসীর দাবি নিয়ে এসেছি’, এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়েই কবিয়াল রমেশ শীলের সেই সাড়া জাগানো গান, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি, ভাই ঢাকা শহর রক্তে রাঙাইলি’।
বাংলা এখন বিশ্বের পঞ্চম ভাষা। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। বাংলা এখন বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সিয়েরা লিওনে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং ভারতে অন্যতম জাতীয় ভাষা। ভারতের পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরায় দ্বিতীয় ভাষা এবং আসামের করিমগঞ্জ, কাছাড় ও হাইলাকান্দি, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জেলা প্রশাসনে বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্দামানের নেইল ও হ্যাভলক দ্বীপে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সিঙ্গাপুরে বেশি-বলা ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা অন্যতম। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা! মঙ্গলগ্রহ অভিমুখে পাঠানো খেয়াযানে মানবসভ্যতার নিদর্শন হিসেবে দেওয়া সূর্যঘড়িতে বাংলা লিপিতে ‘মঙ্গল’ উৎকীর্ণ হয়।
বিশ্বের বড় বড় নগরের মধ্যে বাংলাভাষীরা দৃষ্টিকাড়া বলয় বানিয়ে বসেছে। একটি ভাষার মানচিত্রে দেখা যায়, আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস ও হিউস্টন, শিকাগো ও নিউইয়র্ক এবং ব্রিটেনের লন্ডনে বাংলাভাষীরা সংখ্যায় বেশ ভারী। পরের স্তরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্ন, কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার, ইতালির রোম, গ্রিসের এথেন্স, আবুধাবি, সিঙ্গাপুর ও নেপালের কাঠমান্ডু। এগুলো হলো ছোট ছোট বাংলা টাউন, বাংলার সাংস্কৃতিক ঘাঁটি। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেনে বাংলা স্কুল চালু হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলসে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা অনুমোদিত। ইংল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা জিসিএসইতে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলে বাংলা নিতে পারে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াসে, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড কালচারস এবং চেক রিপাবলিকের প্রাগে বাংলা পড়ানো হয়। চেক অধ্যাপকদের বিশেষ আগ্রহ বাংলার লোকগীতি ও লোকসাহিত্যে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপক ক্লিনটন বি. সিলি একজন জীবনানন্দ-বিশেষজ্ঞ।
সংস্কৃত-পণ্ডিত ভাষাবিশেষজ্ঞ স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন ছিলেন বাংলা ভাষার আদি গবেষক। লন্ডনে উইলিয়াম রাদিচে এবং কেমব্রিজের হানা রুথ টমসন বাংলা নিয়ে গবেষণা করছেন। টমসন বেঙ্গলি কনসাইজ ডিকশনারি প্রণয়ন করেছেন এবং বাংলা ক্রিয়াপদের ব্যবহার তথা ব্যাকরণ সংস্কারের প্রস্তাব তুলে সমকালীন বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লিখেছেন। ইভ্বিয়েনা বীকোভা রুশ ভাষায় লিখেছেন বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো, সিয়াটল এবং রাশিয়ার মস্কোতে যে বাংলা চর্চা হয়, সেখানে ছাত্র, অধ্যাপক বা তহবিলের অনুপাতে উৎসাহ বাড়ে বা কমে।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণদান করে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক আদেশে বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে স্বাধীনতার তিন বছর পরেও অধিকাংশ অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথিতে লিখবেন সেটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছৃঙ্খলা চলতে দেওয়া যেতে পারে না। এ আদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধাসরকারি অফিসসমূহে কেবলমাত্র বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো অন্যথা হলে উক্ত বিধি লঙ্ঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন অফিস-আদালতের কর্তাব্যক্তিগণ সতর্কতার সঙ্গে এ আদেশ কার্যকরী করবেন এবং আদেশ লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি-বিধান ব্যবস্থা করবেন।’
সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানকে পূর্ণরূপে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তিগত বিলের প্রস্তাবের ওপর ১৯৮৭ সালের ২ নং আইন পাস করা হয়। ওই আইন প্রচলনের পরও নিু আদালতে কিছু মামলায় বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে আরজি দাখিল করা হয়। দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ নং আদেশের ১১ নং নিয়ম অনুসারে আরজি বাংলা ভাষা প্রচলন আইন অনুসারে বাংলায় না হয়ে ইংরেজিতে লেখা হওয়ায় ওইসব মামলার বিবাদী পক্ষ আরজি খারিজ করার জন্য আবেদন করে। নিু আদালত ওইসব দরখাস্ত শুনানির পর তা বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষরা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা করে।
নিচু আদালতে ইংরেজিতে আরজি, জবাব, দরখাস্ত ইত্যাদি দাখিল করা বৈধ বলে ঘোষণা দেন। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে ‘অন্য আইনে যাহাই কিছু থাকুক না কেন, এই আইনের বিধান কার্যকর হইবে’ বাক্যটি না থাকায় অনেকে মনে করেন, আদালতের কার্যক্রমে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়নি। হাইকোর্ট রায় দেন যে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিও চলবে।
‘হাশমতউল্লাহ বনাম আজমিরি বেগমে’র মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ বাংলা ভাষা প্রচলন আইনকে সংবিধানের পরিপন্থী বা বেআইনি ঘোষণা না করলেও অধস্তন দেওয়ানি আদালতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার আইনসম্মত বলে ঘোষণা করেছেন।
১৯৯৮ সালের ১ মার্চ ঢাকায় বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের পবিত্র সংবিধানে আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ আর প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সকল আদালতই এই প্রজাতন্ত্রের আদালত।…সম্মানিত বিচারকগণ বাঙালি, বিজ্ঞ আইনজীবীগণ বাঙালি এবং বিচারপ্রার্থীগণও ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে সবাই বাঙালি। সকল আদালত কর্তৃক ঘোষিত রায় বাংলা ভাষায় হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। মুষ্টিমেয় লোকের জন্য এই বিচারব্যবস্থা নয়। এই বিচারব্যবস্থা দেশের সকল মানুষের। সর্বস্তরের আদালতের সম্মানিত বিচারকগণ নিজের মাতৃভাষায় যেন নিপুণভাবে রায় লিখতে পারেন, এই বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এই ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করবে বলে জনগণ আশা করে।’
এর আগে ১৯৮৭ সালের ২২-২৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আপিল বিচারকদের চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত ইংরেজিতে লিখিত এক প্রবন্ধে আমি বলি, ‘এ কথা সত্য যে প্রাচীন ও মধ্যযুগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক দেশে বিচারের কাজে জনগণের ভাষা ব্যবহৃত হতো না। তখনকার দিনে বিচার্য বিষয়গুলো ছিল সংখ্যায় অল্প এবং তাদের প্রকৃতিও ছিল সহজ-সাধারণ। আজ যখন রাষ্ট্রীয় কর্মে জনসাধারণ বেশি করে শরিকানা দাবি করছে এবং সরকারও চাচ্ছে শাসনকর্মে জনগণের অধিকতর অংশগ্রহণ, তখন জটিলতর ও হতবুদ্ধিকর বিচার্য বিষয় সিদ্ধান্তের জন্য আসছে। আমাদের মধ্যে বিদেশি ভাষার ব্যবহার মৌলিক চিন্তাধারাকে ব্যাহত করে। ফলে একটা অবাস্তব আবহাওয়া এবং বিদেশি নজিরের ওপর এক মুগ্ধ নির্ভর-প্রবণতার সৃষ্টি হয়েছে। যদি ন্যায়বিচার সদ্গুণ হয় এবং জনগণের কল্যাণের জন্যই যদি এর কাজ হয়, তবে তা জনগণের ভাষাতেই হওয়া উচিত।’
মানুষের মধ্যে যেমন ভাষাপ্রেম রয়েছে তেমনি ভাষাবৈরিতা আছে। দেশে দেশে ভাষার লড়াই নিয়ে নানা তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ভাষার আন্দোলনে কোনো সংকীর্ণতা ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমরা বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষার দাবি করিনি। সকল মানুষের প্রতি সহমর্মিতায় ২০শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সালে একটি ছোট কবিতায় আমি বলেছিলাম ‘২১শে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা কয়।’ পরের বছর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা কয়’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখি। ২০১১ সালে বাংলা একাডেমী থেকে মৎসংকলিত টোয়েন্টি ফার্স্ট ফেব্রুয়ারি স্পিকস ফর অল ল্যাংগুয়েজেস প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে ৭০টি ভাষায় মাতৃভাষার ওপর একশ পঞ্চাশটিরও বেশি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি ২০০০ প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ইউনেসকোর মহাপরিচালক ভাষার সম্মানার্থে বাংলাদেশের জনগণের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব এক বাণীতে বলেন, ‘বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মুখে যখন কয়েকটি ভাষা বিশ্বভাষায় রূপ নিয়েছে, এটা প্রয়োজনীয় যে আমরা স্থানীয় ভাষার বৈচিত্র্য সমুন্নত রাখি।’
এখানে আমাদের বড় দায়, ভাষার দৈন্যমোচন এবং বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর সমকক্ষ করে তোলা। আমরা সেই দায়মোচনে পরিশ্রমবিমুখ না হয়ে নিজেদের একাগ্রচিত্তে নিবেদন করলে সে হবে আমাদের জন্য মঙ্গলময় ও কল্যাণকর।
দেশের আইন ও সংবিধান সম্পর্কে সম্যক পরিচয় ও উপলব্ধি মাতৃভাষার মাধ্যমে অর্জিত না হলে দেশের প্রশাসনে নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে না এবং আইনের শাসনের আলোকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না–এ বিশ্বাস ও উপলব্ধিতে ২০০৩ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও আমি আইন-শব্দকোষ প্রণয়নে এক উদ্যোগ নিই। ভারতীয় আইন কমিশন ইংরেজ প্রবর্তিত আইনকে দেশের আইন বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তানের হামুদুর রহমান আইন কমিশন ওই মত সমর্থন করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস হওয়ার পর উপমহাদেশে গৃহীত সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্যেও ১৯৪৭-পূর্ব প্রচলিত আইনের ধারাবাহিকতা প্রায় অক্ষুন্ন আছে। বিদেশি বা আন্তর্জাতিক আইনে আমাদের আপত্তি নেই যদি তা আমাদের দেশের আইনের সঙ্গে স্বান্ধীকৃত হয়। যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার মাতৃভাষায় আমাদের আদালতে আশ্রয় বা প্রতিকার লাভ করতে পারে। তবে তার আবেদন যদি অ-বাংলা ভাষায় হয় তবে তাকে তার আরজি, জবাব ও দরখাস্ত বাংলা ভাষায় সত্যায়িত করতে হবে যাতে দেশের বিচারক দেশি ভাষা শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েও দেশি ভাষায় তার বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারেন। সাধু ভাষারীতিতে লিখিত সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন শব্দকোষে আমরা সাধুভাষা অবলম্বন করি। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নির্দেশে চলতি ভাষা ব্যবহারের কথা বললেও পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারি কাজকর্মে সাধু ভাষারীতি অনুসরণ করার জন্য তাগিদ দেন। আমাদের বাংলা বানান ও ভাষারীতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এখন একান্ত বিধেয়।
আমি অন্যত্র বলেছি, ‘যে-ভাষায় বিচারকর্ম সমাধা হয় না, সে-ভাষা বল সঞ্চার করে না, দুর্বল হয়ে থাকে। বাক্যগঠন ও বাক্যবিন্যাসে সে-ভাষায় ঋজুতা, দৃঢ়তা, নির্দিষ্টতা ও নিশ্চয়তার অভাব দেখা দেয়। আইন ও বিচারকার্যে ব্যবহারের ফলে একটি ভাষার উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। ইংল্যান্ডে বিচারকর্মে নরম্যান-ফ্রেঞ্চ ভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজির প্রচলন ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। শেক্সপিয়ারের যুগে নাট্যশাস্ত্র ও ব্যবহারশাস্ত্র যুগপৎ ঋদ্ধি লাভ করে। নিজেদের ভাষার কল্পিত দৈন্যের অজুহাতে অন্য ভাষার দ্বারস্থ হওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আমাদের ভাষার দৈন্যমোচনের প্রথম পদক্ষেপটাই হবে আদালতে সেই ভাষার প্রচলন, সে-ব্যবহার তেমন দক্ষহস্তে না হলেও।’
পরাধীন জাতি স্বাধীন হলেও পরাধীনতার খোয়ারি কাটতে দেরি হয়। আমরা সংবিধানে বাংলা পাঠের সঙ্গে ইংরেজি পাঠের বিধান রাখি। সামরিক শাসনামলে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোতে ইংরেজি পাঠ-কে আমরা প্রাধান্য দিই।
একুশে ফেব্র“য়ারি ষাট বছরেও আমরা শুনি যে, বাংলা ভাষার জাতীয়করণের জন্যই আমরা শিক্ষায় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য পিছিয়ে যাচ্ছি। এমন কথাও শোনা যায়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে অনন্যোপায় হয়ে শিল্পের জাতীয়করণ করে আমাদের অব্যবস্থা ও দুর্গতি হয়েছিল, অনুরূপ দুর্গতি ঘটবে যদি আমরা রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বাড়াবাড়ি করি। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের কথা উঠলে বলা হয়, আমরা নতুন ইস্যু নিয়ে অযথা ঘোঁট পাকাচ্ছি। মনে হয়, আমাদের একমাত্র প্রাসঙ্গিক ইস্যু নিজের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করার জন্য কিভাবে ক্ষমতায় যাওয়া। অন্যসব প্রসঙ্গের প্রতি আমাদের আর কোনো উৎসাহ, আনুগত্য ও মমত্ত্ব নেই।
‘উচ্চ আদালতের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধে আমি বলি, ‘আমরা কি যাব না তাদের কাছে, যারা শুধু বাংলায় কথা বলে?’ –এই আর্ত প্রশ্নের আমরা কোন উত্তর পাইনি।
দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনেকের মাঝে বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা দেখে আমি মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ-এর পূর্বভাষে বলেছিলাম, ‘একটা চিন্তা মাঝে মাঝে মনে আসে, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে এই ফরমানের বিরুদ্ধে যদি এলান করা হতো “ইংরেজিই রাষ্ট্রভাষা থাকবে”, তবে কি আমাদের সমাজে কোনো ব্যত্যয় দেখা দিত?’
ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে খ্রিস্টান মিশনারি দেশে দেশে ভাষার প্রচলন, উৎকর্ষ সাধন, লিপি উদ্ভাবন, ব্যাকরণ-অভিধান প্রণয়ন ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। আজ আমরা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের প্রবক্তা হয়ে সেদিকে যথাযথ মন দিচ্ছি না। একুশে ফেব্র–য়ারির গত ষাট বছরের চল্লিশ বছর কেটেছে স্বাধীন বাংলাদেশের আমলে। স্বাধীনতার আগে তৎকালীন প্রাদেশিক কাঠামোয় বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে কাজ করার জন্য কোন বাধা না থাকলেও এবং স্বাধীনতার পরে প্রতি বছর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের অঙ্গীকার করেও আমাদের প্রয়াস অকিঞ্চিৎকরই রয়েছে। আমরা এ পর্যন্ত কোন ভাষানীতি প্রণয়ন করিনি। আমরা কী লক্ষ্যে কাকে প্রণোদনা দেব আমরা তা জানি না। এবং ক্ষমতার অর্জন ও বিসর্জনে আমরা যে আবেগ ও উৎসাহ দেখিয়েছি সেই পরিমাণে মাতৃভাষার উন্নয়নে আমরা কৌতূহলও দেখায় নি। প্রায় সম অনীহা ও অকৌতূহল দেখা যায় বিচার বিভাগকে নির্বাহী থেকে পৃথকীকরণ এবং স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসনের ব্যপারে সাংবিধানিক নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে। জ্ঞানের রাজ্যে বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহার বড়ই অপ্রতুল। একুশের ষাট বছরে আমাদের ভাষা দৈন্যমোচনে আমাদের যে কর্তব্য শুধু যে তা পালন করতে হবে তাই নয় একুশ ফেব্র–য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের ওপর আর একটা বাড়তি দায়িত্ব পড়েছে সকল ভাষার উন্নতিকল্পে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে ঘরে বদান্যতা প্রদর্শন করে আমাদের দেশে যে অ-বাংলা ভাষা রয়েছে তা সংরক্ষণ ও প্রসারণের জন্য বিশেষভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
আজ থেকে ষোল বছর আগে যতদিন না আমরা স্বাক্ষরতার আশীর্বাদ প্রতিটি নাগরিকের ঘরে পৌঁছে দিতে পারছি, যতদিন বকলম ও ঢেরা সহির রেওয়াজ উঠে না যাচ্ছে, যতদিন নির্বাচনের প্রতীক হিসেবে হুক্কা, ধানের শীষ বা নৌকার প্রচলন বন্ধ না হচ্ছে এবং নিচের কাঠামো থেকে সমাজের উপর কাঠামো সকল কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে সর্বোচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততদিন বাংলা ভাষার সংগ্রাম আমি অসমাপ্ত বলে গণ্য করবো।
উনিশ শ’ ছিয়ানব্বই ইংরেজি সালের এই অগৌরবের ফেব্রুয়ারিতে এসব কথা কে বা কারা শুনবে বা পড়বে? সেই সংশয় এখনো যায়নি। বাংলা ভাষার সংগ্রাম চলবেই চলবে।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

দুর্নীতি ঠেকাতে পহেলা রাতে বিল্লি মারতে হবে


habibur1111111১৯৭১ সালে আমরা অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিদ্রোহ করি। এই বাক্যের আটটি শব্দ ১৯১৮ সালের মানবাধিকারের ঘোষণা থেকে নেওয়া। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি বিরোধী আইন এবং ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার মধ্যে বছরখানেকের ব্যবধান ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানের পর দেশের পুনর্গঠনকল্পে সরকারি অর্থ পরিব্যয় ও টাকা পয়সার লেনদেন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিকাশ ঘটতে পারে এই দুর্ভাবনায় দুর্নীতি দমন আইন পাস করা হয়। দেশ ভাঙ্গা ও দেশ গড়ার ফলে দুর্নীতিবাজদের সম্মুখে এক মহোৎসব দেখা দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতায় তার প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পায়।
উৎকোচ প্রদান একটি পুরোনো প্রথা।কোরান শরিফে বিচারকদের উৎকোচ না দেওয়ার জন্য নসিহত করা হয়েছে। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে বলেছেন, ’জলে বিচরণশীল মৎস্য জল গ্রহণ করে কি করে না তার নির্ণয় করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি সরকারে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের জন্য অর্থ গ্রহণ করে কি না তা নির্ণয় করা কঠিন।’
ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারই হচ্ছে দুর্নীতি। প্রশাসনযন্ত্রের কার্যকারিতার গতি ঘর্ষণমুক্ত ও দ্রুত করার জন্য যে উৎকোচ প্রদান করা হয় তাকে আমরা ছোট দুর্নীতি বলতে পরি। সামরিক বিমান, জাহাজ, রসদ, পরিবহন ও যোগযোগযন্ত্র; মহাসড়ক, বাঁধ, সেতু ইত্যাদি প্রকৌশলী উদ্যোগ; রাষ্ট্রীয় ভিত্তিতে ভোগপণ্য ক্রয়বিক্রয়; স্কুলের পাঠ্যপুস্তক, হাসপাতাল ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরামর্শকের ফি ইত্যাদি খাতে মহাদুর্নীতির রাঘববোয়ালরা বিচরণ করে। এক সময় লেখকদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য সরকার কিছু লেখকদের পাঁচশ’ কপি বই কেনার ব্যবস্থা নেন। লেখকদের কী সুবিধা হয় জানি না। দুর্নীতিবাজ প্রকাশকরা বইয়ের মূল্য বৃদ্ধি করে এথেকে টাকা অর্জন করেন। দলীয়তা ও দুর্নীতি দুই ঘোড়া একসঙ্গে গাড়ি টানে।
সহস্রহস্ত দুর্নীতি-দানবের গতিবিধি সর্বত্র । অফিস-আদালতের কথা সবাই জানে না। কিন্তু এখন এমনসব স্থানে দুর্নীতি হচ্ছে আগে যা কল্পনা করাও যেত না। বিদ্যাদানের জন্য বা স্কুলের নামের জন্য আগে ভালো ছাত্রদেরকে শিক্ষকরা বিনা বেতনে আলাদা করে যত্ন করে পড়াতেন। এখন শিক্ষকরা ক্লাসের পড়ায় ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট টিউশনি করছেন। প্রশ্লকর্তার সঙ্গে পরিচয়ের কথা প্রকাশ করে সাজেশন দিয়ে কোচিং ক্লাসে ছাত্রদের আকৃষ্ট করছেন। ভর্তি হবার আগে স্কৃল কর্তৃপক্ষকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়। ভর্তি ফরম কেনার সময় ছাত্রদের বড়-ভাইদেরও চাঁদা দিতে হয়। এভাবে স্কুল-কলেজের শিক্ষা লাভের অধিকার আজ নানাভাবে বিঘ্নিত।
অন্যায় উদ্দেশ্যে, অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনায় ও অযৌক্তিকভাবে সরকারের যে অপব্যয় ঘটে এর প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। আর যে অপব্যয় সামান্য নয়, হাজার হাজার কোটি টাকার মহা লোকসানি।
প্রশাসনে দুর্নীতির খাদ যাচাই-পরখ করার জন্য মানবাধিকার-কষ্টিপাথরের আশ্রয় নিতে হবে। যে মানবাধিকার সকল মানুষের সমতা, সমান সুযোগের অধিকার এবং আইনের সমক্ষে সমান আশ্রয়ের কথা বলে তা দুর্নীতির কারণে দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। বিভিন্ন মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তাকে মেনে নিয়ে সকল মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখার যে অঙ্গীকার সংবিধানে করা হয়েছে তা দুর্নীতির কারণে বিঘ্নিত হয়। কারণ দুর্নীতি বৈষম্যের সৃষ্টি করে। দুর্নীতির জন্য সবাই সমান সুযোগ পায় না, আইনের সমান আশ্রয় পায় না এবং সরকারি সেবাখাত থেকে সমান সেবাও পায় না। যে সমাজে মানবাধিকার ক্রমাগতভাবে লঙ্ঘিত হয় সেখানে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হতে পারে এবং আইলা-সিডরের মতো বড় দুর্বিপাক ঘটলে ধনী-দরিদ্র কারো নিরাপত্তা আর সেখানে নিশ্চিত থাকবে না।
দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে যে দেশ পরপর পাঁচবার শীর্ষস্থান অধিকার করেছে, যে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-পৃথিবীর প্রচন্ডতম শিক্ষাঙ্গন, যে দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম দ্বিতীয় বৃহত্তম বিপজ্জনক সামুদ্রিক বন্দর, যে দেশের একটি ছাড়া প্রত্যেকটি জেলায় একসঙ্গে বোমা বিস্ফোরণ হয়, যে দেশে কর্মরত বিচারক সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হন, যে দেশের দুজন রাষ্ট্রপতি অঘোরে প্রাণ হারান, যে দেশে জেলখানার দুর্ভেদ্য আশ্রয়ে রাজনীতিকরা নিহত হন, যে দেশে উল্লেখযোগ্য নরহত্যার বিচার হয় না সেই দেশকে আমরা ব্যর্থ না বলে কেউ অনুকম্পাবশত ভঙ্গুর বলে থাকি।
আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলা ফাটাই। কিন্তু তা রোধ করতে গাঁইগুঁই করি। সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি হয় ভাশুর নয় ভাগনে হয়ে যান। গণতন্ত্রের পুনরাবির্ভাবের সময় বিচারপতি আনসার আলীকে একটি কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনটি আজও দিনের আলো দেখল না। দুয়েকজন রাজনীতিক ছাড়া এ ব্যাপারে কেউ উচ্চবাচ্য করেন না। ওই প্রতিবেদনে কি তাদেরই মুখচ্ছবি উজ্জ্বল হয়ে আছে খবরের কাগজে যাদের নাম ফাটে, যাদের নিয়ে হর্স ট্রেডিং হয় ? আমাদের দেশের জলবায়ু ঘোড়ার জন্য অনুকূল নয় বলে আমি দল ভাঙাভাঙির খেলাকে খচ্চর নিয়ে টানাটানি বলি।
মামলা রুজু ও প্রত্যাহারের ফলে দুর্নীতি কমে না, বরং বৃদ্ধিই পায়। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ দায়ের করা হয়, তার মধ্যে দুটি মামলা চূড়ান্তভাবে শেষ হয়। প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ-রাজনীতিককে দলে টানার জন্য তার জামিন দেওয়া-নেওয়া নিয়ে যে প্রহসনের সৃষ্টি হয় তাতে আদালতের সুনাম ক্ষুন্নই হয়। প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের মামলার শুনানি বিলম্বিত হয় সরকারের আইন পরামর্শকদের অনাপত্তিতেই।
বিদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের সময় সরকারকে যারা পরামর্শ দেন তাদের কেউ কেউ চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর অম্লানবদনে সেই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ব সংস্থার পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন এবং এ ব্যাপারে ’স্বার্থের সংঘাত’-এর নীতি সম্পর্কে কোনো দুর্ভাবনাও নেই। কোনো বিব্রতবোধ নেই। আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাদের অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা হেতু যে ক্ষতি হচ্ছে তা আমাদের বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়। কিন্তু শিক্ষিত বিভীষণদের ষড়যন্ত্রে যে অপূরনীয় ক্ষতি হচ্ছে তা সময়মতো প্রতিহত করতে না পারায় আমরা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে বড় নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। সংসদ বর্জনের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তিগুলো নিয়ে সংসদে কোনোই আলোচনা হচ্ছে না। যেসব তথ্য দেশের জনগণের স্বার্থে উদঘাটিত হয় না, সেসব তথ্য অনিয়মিতভাবে কনসালটেন্সির মাধ্যমে অতি সহজেই পাচার হচ্ছে।
দুর্নীতি এক মহাবিদ্যা না পড়লে ধরা। দুর্নীতির ভেতরে একটা রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চার আছে, আছে উত্তেজনা ও পুলক। দাওমারার লোভ। “ দিলাম ফাঁকি ধরতে পারল না”-অহঙ্কারের বিষয়।
আজ দেশে দেশে দুর্নীতি বিরাজমান। চীনের মতো শৃঙ্খলাপর পরিবেশে এবং প্রাণদন্ডের একাধিক দৃষ্টান্ত থাকলেও দুর্নীতির মাত্রা তেমন কমছে না। বড় দেশে দুর্নীতির বড় কেসসা আছে। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাই। বিচারকগণকে কিভাবে শৃঙ্খলা-শাসনের মধ্যে রাখা যায় তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমি মিসিসিপি জুডিশিয়াল পারফরমেন্স কমিশনের কার্যালয়ে যাই। অসদাচরনের কিছু নমুনা তাদের প্রতিবেদন থেকে উল্লেখ করি। অন্য বিচারকের বৈচারিক কর্মে অনধিকার হস্তক্ষেপ; অন্য বিচারকের বিরুদ্ধে অযথাযথ আচরণের অভিযোগ, আদালত-অবমাননা, আইনের অপব্যবহার, সরকারি পদক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে অন্য বিচারকদের কাছ থেকে অনুগ্রহ প্রার্থনা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে পুলিশ অফিসারকে ধমক দেওয়া বা তার চাকরি খাওয়ার চেষ্টা করা, কারাবন্দীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো, অসদাচরণ- জাতীয় উদ্দেশ্যে কোর্টের কর্মচারীদের ব্যবহার, বিচার প্রণালীর এবং কোর্টের এখতিয়ার সম্পর্কিত বিধির লঙ্ঘন, অতিরিক্ত ফি ও খরচ আদায়, বিচার্য বিষয়ে আর্থিক স্বার্থ থাকার, অপরাধীর অবর্তমানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শ্রবণ, জরিমানার প্রতিবেদন না দেওয়া, জরিমানার টাকা তসুরপাত ও নিজের জন্য ব্যয় করা, অনিয়মিত হিসাবরক্ষণ, রাজনৈতিক দলে সক্রিয় থাকা বা বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরও মেয়র বা মহানগর পুলিশকর্তা হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের দেশে ইন্সপেকশন তদারকি একদম উঠে গেছে। সকল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কাজের দেখাশোনা করা দরকার।
দুর্নীতির শাস্তি হওয়া উচিত। “লোকটা অবসর নিতে যাচ্ছে এখন চাকরিচ্যুত হলে পথে বসবে”-এই অনুকম্পায় আমি বিভাগীয় তদন্ত শেষ হতে দেখেছি। খবরের কাগজে দেখেছি, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকে দুর্নীতির জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বঙ্গভবনে ডেকে চা খাইয়ে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে। মানীর মান মান্যবরগণ সযত্নে রক্ষা করেছেন।
আজকাল দুর্নীতিবাজরা যেমন বদমায়েশ তেমনি বিদগ্ধ ও বিচক্ষণ। গত তত্ত্বাবধায়ক আমলে হাওয়া বুঝে কোনো কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি স্বপ্রনোদিত হয়ে কয়েকশ কোটি সরকার পাওনা পরিশোধ করেন। কত শো কোটি গায়েব করা হয় তা সৃষ্টিকর্তা হয়তো জানেন। আধুনিক প্রযৃক্তির সঙ্গে তাল না রাখতে পারলে মুখস্তবিদ্যায় পারদর্শী, হাবাগোবা ও নিরীহ আমলা বড় জোর রেজিস্ট্রি অফিস, রেভিনিউ অফিস, থানার ফকিরি দুর্নীতি ধরতে পারবেন কিন্তু তাঁর পক্ষে দেশি ওস্তাদ, দরবেশ ও তাদের আন্তর্জাতিক দোঁসরদের কেশস্পর্শ করা সহজ হবে না। আজকাল আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে যে অদৃশ্য চৌকস দুর্নীতি হচ্ছে তা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। চালানের অবমূল্যায়ন-অধিমূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে মানিলন্ডারিং অ্যাক্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। ফলে সরকার যে শুধু ন্যায্য রাজস্ব থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে না, আর্থিক কর্মকান্ডে যে বিষময় পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে তাও রোধ করতে পারছে না।

দুর্নীতি-বিরোধী চেতনা সৃষ্টির জন্য যারা সুপারিশ করেন এবং মিডিয়ার আশ্রয় নিতে পমামর্শ দেন তাদের আমি শুভেচ্ছা জানাই। একুশের চেতনা বা একাত্তরের চেতনা থুবড়ে রাস্তায় পড়ে আছে। একেবারে নিষ্প্রাণ। নতুন মানবন্ধন সম্পর্কে একজন বড় দুঃখ করে বলেছেন, এমন করে একশ বছর দাঁড়িয়ে থাকলে এ মানববন্ধনে কিছু হবে না। দুর্নীতি দমন করতে হলে সাফল্যের সঙ্গে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। যদি আপনারা দুর্নীতি বিরোধী প্রচার করতে চান তবে এ পর্যন্ত কোন কোন মহাপ্রাণ দুর্নীতিবাজ এবং তাঁদের দুর্নীতির রকম কী ছিল যা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে পরে প্রকাশিত হয়েছে তা প্রকাশ করেন। আইনের অছিলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কতটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয় তার হাস্যকর বৃত্তান্ত লোকের সমক্ষে তুলে ধরেন। দুর্নীতি দমনে কত নথিপত্র হারিয়েছে বা পথ ভুলেছে তার হিসাব প্রকাশ করেন। কোন কোন মামলা কী কী কারণে কার কার অদক্ষতায় ও অপারঙ্গমতায় এত সময় ক্ষেপণ হয়েছে তা প্রকাশ করেন। দুর্নীতির প্রসার ঠেকাতে হবে – পহেলা রাতে বিল্লি মারতে হবে। এবং সদাশয় সরকারকে যথাযথ আইন প্রণয়ন করে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধতে হবে।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।